GuidePedia

0
সমকামিতা (ইংরেজি:হোমোসেক্‌শুয়্যালিটি) একটি যৌন প্রবৃত্তি, যার দ্বারা সমলিঙ্গের ব্যক্তির প্রতি যৌন আকর্ষণ বোঝায়। এইরূপ আকর্ষণের কারণে সমলিঙ্গীয় মানুষের মধ্যে প্রেম বা যৌনসম্পর্ক ঘটতে পারে। প্রবৃত্তি হিসেবে সমকামিতা বলতে বোঝায় মূলত সমলিঙ্গের ব্যক্তির প্রতি "এক যৌন, স্নেহ বা প্রণয়ঘটিত এক ধরনের স্থায়ী ও প্রাকৃত প্রবণতা"। এই ধরনের সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ব্যক্তিগত বা সামাজিক পরিচিতি, এই ধরনের আচরণ এবং সমজাতীয় ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত এক সম্প্রদায়ের সদস্যতাও নির্দেশিত হয়।

সমকামিতার ব্যাপারটি আধুনিক জীববিজ্ঞানীরা একটি নিখাঁদ বাস্তবতা বলেই মনে করেন। জীববিজ্ঞানী ব্রুস ব্যাগমিল তার ‘বায়োলজিকাল এক্সুবারেন্স : এনিমেল হোমোসেক্সুয়ালিটি এন্ড ন্যাচারাল ডাইভার্সিটি’ বইয়ে প্রায় পাঁচশ প্রজাতিতে সমকামিতার অস্তিত্বের উদাহরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। সামগ্রিকভাবে জীবজগতে ১৫০০ রও বেশী প্রজাতিতে সমকামিতার অস্তিত্ব প্রমাণিত। তালিকায় স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে শুরু করে পাখি, মাছ, সরীসৃপ, উওভচর, কীটপতঙ্গ সবই আছে। বিজ্ঞানীরা এখন মনে করেন, পৃথিবীতে আসলে এমন কোন প্রজাতি নেই যেখানে সমকামিতা দেখা যায় না। সমকামিতা ছাড়াও প্রাণিজগতে উভকামিতা এবং রূপান্তরকামিতারও বহু প্রমাণ পাওয়া গেছে



মানব সমাজে সমকামিতা

বিষমকামী-সমকামী অনবচ্ছেদ অনুসারে যৌন প্রবৃত্তির প্রধান তিনটি বর্গের অন্যতম হল সমকামিতা (অপর বর্গদুটি হল উভকামিতা ও বিষমকামিতা)। বিভিন্ন কারণে গবেষকেরা সমকামীরূপে চিহ্নিত ব্যক্তির সংখ্যা বা সমলৈঙ্গিক যৌন সম্পর্কে অভিজ্ঞতাসম্পন্নদের অনুপাত নির্ধারণ করতে সক্ষম হন নি।

আধুনিক পাশ্চাত্য জগতে বিভিন্ন প্রধান গবেষণার ফলে অনুমিত হয় সমকামী বা সমলৈঙ্গিক অভিজ্ঞতাসম্পন্নরা মোট জনসংখ্যার ২% থেকে ১৩%। ২০০৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, জনসংখ্যার ২০% নাম প্রকাশ না করে নিজেদের মধ্যে সমকামী অনুভূতির কথা স্বীকার করেছেন; যদিও এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে খুব অল্পজনই নিজেদের সরাসরি সমকামীরূপে চিহ্নিত করেন।

মানবজাতির সামগ্রিক ইতিহাসে সবসময়ই সমকামিতার অস্তিত্ব ছিলো। সমকামীদের সন্ধান মিলবে পৃথিবীর সর্বত্র, প্রতিটি যুগে প্রতিটি সময়ে কিংবা প্রতিটি স্থানেই। কোন কোন জায়গায় সমকামিতা রীতিমত উদযাপন করা হত সংস্কৃতির অংশ হিসেবেই। প্রাচীন গ্রীসে পাইদেরাস্ত্রিয়া, কিংবা এরাস্তেস এবং এরোমেনোস-এর সম্পর্কগুলো উল্লেখযোগ্য। সমকামিতার প্রছন্ন উল্লেখ আছে প্রাচীন বহু সাহিত্যে। হোমারে বর্ণিত আকিলিস এবং পেট্রোক্লুসের সম্পর্ক, প্লেটোর দার্শনিক গ্রন্থ সিম্পোজিয়ামে ফায়াডেরাস, পসানিয়াস, এগাথন, অ্যারিস্টোফেনেস, এরিক্সিমাচুসের নানা বক্তব্য এবং সক্রেটিসের সাথে আলকিবিয়াডসের প্লেটোনিক সম্পর্ককে বহু বিশেষজ্ঞ সমকামিতার দৃষ্টান্ত হিসেবে হাজির করেন। খ্রীস্টপূর্ব ছয় শতকের গ্রিসের লেসবো দ্বীপের উল্লেখযোগ্য বাসিন্দা স্যাপো নারীদের নিয়ে, তাদের সৌন্দর্য নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন। এই লেসবো থেকেই লেসবিয়ান (নারী সমকামিতা) শব্দটি এসেছে। বহু রোমান সম্রাট - যেমন জুলিয়াস সিজার, হাড্রিয়ান, কমোডাস, এলাগাবালাস, ফিলিপ দ্য এরাবিয়ান সহ অনেক সম্রাটেরই সমকামের প্রতি আসক্তি ছিলো বলে ইতিহাসে উল্লিখিত আছে। রেনেসাঁর সময় বহু খ্যাতনামা ইউরোপীয় শিল্পী যেমন, দোনাতেল্লো, বত্তিচেল্লী, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এবং মাইকেলেঞ্জেলোর সমকাম প্রবণতার উল্লেখ আছে। চৈনিক সভ্যতা এবং ভারতীয় সংস্কৃতিতেও সমকামিতার উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন বিষ্ণুর মোহিনী অবতাররূপে ধরাধামে এসে শিবকে আকর্ষিত করার কাহিনী এর একটি দৃষ্টান্ত। বিষ্ণু (হরি) এবং শিবের (হর) মিলনের ফসল অয়াপ্পানকে হরিহরপুত্র নামেও সম্বোধন করা হয়। এ ছাড়া অষ্টাবক্র, শিখন্ডী এবং বৃহন্নলার উদাহরণগুলো সমকামিতা এবং রূপান্তরকামিতার দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে উঠে এসেছে।

সমকামিতার সামাজিকতা

মানবজাতির লিখিত ইতিহাসের সমগ্র সময়কাল জুড়ে সমকামী সম্পর্ক ও আচরণ নিন্দিত হয়ে এসেছে। তবে কখনো-কখনো সামাজিক ঔদার্য ও আনুকূল্যও পরিলক্ষিত হয়েছে। বলা হয়, এই প্রশংসা ও নিন্দা নির্ভর করেছে সমকামিতার বহি:প্রকাশের রূপ বা সমকালীন সাংস্কৃতিক মানসিকতার উপর। তবে অধিকাংশ সমাজেই সমকামী আচরণকে দণ্ডণীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এমনকি বহু দেশে সমকামী আচরণের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার বিধানও রাষ্ট্রিয়ভাবে চালু আছে।

সমকামিতা আবহমানকাল ধরে অসামাজিক বিবেচিত হয়েছ এর যৌক্তিক কারণ হলো এই যে, এটি এমন একটি যৌনাচরণ যার মাধ্যমে সন্তান জন্ম দান সম্ভব নয়, ফলে মানুষের বংশরক্ষা সম্ভব নয়। এছাড়া সকল প্রধান ধর্ম সমকামী যৌনাচরণ নিষিদ্ধ করেছে। আধুনিক সমাজেও সমকামী যৌনাচরণ একপ্রকার যৌন বিকৃতি হিসাবেই সাধারণভাবে পরিগণিত। তবে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে মন:স্তাত্ত্বিকরা 'সমকাম প্রবণতাকে' মনোবিকলনের তালিকা থেকে বাদ দেয়। ১৯৭৫-এ ঘোষণা করা হয় 'সমকাম প্রবণতা' কোন মানসিক বিকৃতি নয়। তথাপি সমকামী যৌনাচারণের প্রতি সাধারণ মানুষের বৈরীভাব অটুট আছে। অধিকাংশ সমাজে সমকামী যৌনাচারণ লজ্জার ব্যাপার এবং ধিক্কারযোগ্য। ধর্ম এবং আইনের কঠোর বিধান এবং সামাজিক অনুশাসনের কারণে কার্যকলাপ তথা সমকামী যৌনসঙ্গম একটি গুপ্ত আচরণ হিসাবেই প্রবহমান।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Top