GuidePedia

0

রূপকথার সোনার ডিম পাড়া হাঁসের গল্প সবাই জানেন। তবে, কেবল রূপকথায় নয় বাস্তবেও কখনো কখনো মিলে যায় অমূল্য সোনার ডিম! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক পুরোনো লোহা-লক্কড়ের কারবারির ভাগ্যেও ঘটেছে তেমনি এক ঘটনা। ভাঙারির দোকানে জিনিসটা দেখেই তাঁর পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। তেপায়ায় বসানো ওই সোনালি ডিমের বাইরে একটা সাদা পাথর, ভেতরে ঘড়ি। কিন্তু তখন কে জানত এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রুশ সম্রাট-সম্রাজ্ঞী আর বলশেভিক বিপ্লবের ইতিহাস! কে জানত আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে এই রত্ন এত দিন কোথায় হারিয়ে ছিল। আর কেইবা ভাববে ভাঙারির দোকানে পাওয়া এই সোনার ডিমের দাম হতে পারে দুই থেকে তিন কোটি ডলার!

পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর লন্ডনের ‘ভার্তস্কি’ নিলামঘর নিশ্চিত হয়েছে এই সোনার ডিমটি রুশ সাম্রাজ্যের দরবার থেকে হারিয়ে যাওয়া সম্রাজ্ঞীকে দেওয়া সম্রাটের সেই ঐতিহাসিক উপহার। বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী ওই মার্কিনির নাম না প্রকাশ করলেও বিশ্বখ্যাত নিলামঘরটি জানিয়েছে, ইতোমধ্যে এ রত্নটি কিনে নিয়েছে তারা। বিক্রিও করে দিয়েছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্রেতার কাছে। তবে, তারা এটাও জানিয়েছে, ক্রেতা আর যেই হন না কেন রুশ দেশের কেউ নন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।

রাশিয়ার জার-জারিনারা (সম্রাট-সম্রাজ্ঞী) অপরিমিত বিত্ত-বৈভবে পূর্ণ যে খামখেয়ালি জীবনযাপন করতেন, তাতে হয়তো কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। তবে, তাঁরা আশ্চর্য হতে চাইতেন। ঐশ্বর্যের পরিমাণ যখন লাগামহীন, তখন কী পরিমাণ স্বর্ণ বা মণি-রত্ন দিয়ে তা বানানো, সেটা আর বিষয় থাকেনি, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল অলংকার-উপহার সামগ্রীর নকশার সৌকর্য, নির্মাণের নিপুণতা আর সর্বোপরি তার অভিনবত্ব। এ কারণেই হয়তো রাজকীয় স্বর্ণকার পিটার কার্ল ফাবার্গিকে সম্রাট তৃতীয় আলেক্সান্ডার যখন তাঁর স্ত্রীর জন্য বিশেষ এই উপহার বানাতে দেন, তখন শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন—এটা বানাতে হবে কঠোর গোপনীতায় এবং এতে থাকতে হবে সম্রাজ্ঞীকে আশ্চর্য করার ক্ষমতা। ১৮৮৭ সালের ইস্টারের উত্সবে সম্রাজ্ঞী মারিয়া ফিওদোরোভনা সম্রাট তৃতীয় আলেক্সান্ডারের কাছ থেকে যে আশ্চর্য উপহার পেয়েছিলেন, এটাই সেই সোনার ডিম।

১৯১৭ সালে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে রুশ সম্রাটের পতন হয়। সম্রাটের পতনের পর পিটার্সবার্গের প্রাসাদ থেকে অন্য অনেক ধনরত্নের সঙ্গে পাচার হয়ে গিয়েছিল এই সোনার ডিমও। পিটার্সবার্গ থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে তা চলে এসেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু এরপর এত দিন এটা কোথায় ছিল—তা জানা যায়নি। জানা যায়নি এটা কীভাবে ভাঙারির দোকানে এল সেই ইতিহাসও।

রুশ দেশের এই সোনার ডিম খুঁজে পাওয়া ভাগ্যবান মার্কিনির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি গণমাধ্যমের। তবে, লন্ডনের ‘ভার্তস্কি’ নিলামঘর জানিয়েছে, ভাঙারির দোকান থেকে মাত্র ১৪ হাজার ডলার দিয়ে এটা কিনেছিলেন ওই মার্কিনি। কিন্তু ঘড়ি আর পাথরসহ এর আশানুরূপ দাম না পেয়ে হতাশ হয়ে সোনার ডিমটি স্বর্ণকারের দোকানে নিয়ে গলিয়ে ফেলতেও চেয়েছিলেন তিনি। পরে এটা নিয়ে ইন্টারনেটে খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে তাঁর ধারণা হয় যে, এটা রুশ সম্রাজ্ঞীর সোনার ডিম। এর পরই লন্ডনের ওই নিলামঘরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি।


যুক্তরাষ্ট্রে ‘ভার্তস্কি’ নিলামঘরের ডিলার পরিচালক কিয়েরেন ম্যাকার্থি রয়টার্সকে বলেছেন, ‘তাঁর মুখ-চোখ, গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। সাধারণ জিনস আর চেক শার্ট পরা একটা লোক আমার হাতে রুশ সম্রাজ্ঞীর এই হারিয়ে যাওয়া সোনার ডিমটি দেন।’ ছবি দেখে নিশ্চিত হওয়ার পর মধ্য-পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রের একটি ছোট্ট শহরে তাঁর বাড়ির রান্নাঘর থেকে এটা হাতে পায় নিলামঘরের লোকজন।

মূল্যবান রত্নভান্ডার নিলামের সঙ্গে সম্পর্কিতরা জানিয়েছেন রুশ সাম্রাজ্যের এই ঐতিহ্যবাহী সোনার ডিমটির দাম অন্তত দুই থেকে তিন কোটি ডলার হতে পারে। সম্রাটের রত্নভান্ডারের বিষয়ে আগ্রহী রুশ ব্যবসায়ী আলেক্সান্ডার ইভানভ জানিয়েছেন, ২০০৭ সালে এমন একটি ‘ফাবার্গি এগ’ (ফাবার্গির তৈরি ডিম) ১৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারে কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি।

রুশ সম্রাটের স্বর্ণকার পিটার কার্ল ফাবার্গি ১৮৮৫ থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে এমন ৫০টি সোনার ডিম বানিয়েছিলেন সম্রাটের পরিবারের জন্য। ফাবার্গি জানিয়েছিলেন ওগুলোর মধ্যে ৪২টি টিকে ছিল। এ ছাড়া কয়েকজন ব্যবসায়ীকেও এমন কিছু সোনার ডিম বানিয়ে দিয়েছিলেন ফাবার্গি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

 
Top